মে দিবসের ইতিহাস : শ্রমিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
১লা মে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে পালিত হয় শ্রমিক দিবস হিসেবে। আর এই দিবস পালনের আছে একটি প্রেক্ষাপট। শ্রমিক দিবসের চেতনা শ্রমিকদের আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত। ১৮৮৬ সালে ১লা মে আমেরিকার মেহনতি শ্রমিক শ্রেণি দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিসহ আরও কয়েকটি ন্যায্য দাবি ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে জীবন বিসর্জন দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব শ্রমিক আন্দোলনের সূচনা করেছিল।
১লা মে’র ঐ দিনের আগে যুক্তরাষ্ট্র বা বিশ্বের কোথাও শ্রম আইন ছিল না। শ্রমিকদের মানবিক ও অর্থনৈতিক অধিকার বলতে কিছুই ছিল না। তারা ছিল মালিকদের দাস মাত্র। তাদের কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না। ছিল না সাপ্তাহিক কোনো ছুটি। ছিল না চাকরির স্থায়িত্ব ও ন্যায্য মজুরির নিশ্চয়তা। মালিকরা তাদের ইচ্ছামতো শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করিয়ে নিত। এমনকি দৈনিক ১৮-২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতেও বাধ্য করত শ্রমিকদের। এ অন্যায় বঞ্চনা ও জুলুমের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকরা পর্যায়ক্রমে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। তাদের মধ্যে এই জমে থাকা ক্ষোভ একসময় বিক্ষোভে পরিণত হয়।
তা প্রথম ১৮৮৫ সালের ৭ অক্টোবর শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজের ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে বিক্ষোভ করে। আর তারা তাদের এই দাবি মানার জন্য মালিকপক্ষকে ১৮৮৬ সালের ১লা মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। মালিকপক্ষ শ্রমিকদের বেঁধে দেওয়া দাবিকে অবজ্ঞা করে তাদের অনিয়ম, অবিচার আর দুর্নীতির স্টিম রোলার চালাতে থাকে অবিরত।
আন্দোলনের ঘটনা
এ আন্দোলনের অংশ হিসেবে ‘আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার’-এর ১৮৮৫ সালের সম্মেলনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে ১৮৮৬ সালের ১লা মে আমেরিকা ও কানাডার প্রায় তিন লক্ষাধিক শ্রমিক শিকাগোর ‘হে মার্কেট’-এ জড়ো হয়। শ্রমিক ও তরুণ নেতা আগস্ট স্পাইসের নেতৃত্বে এক বিক্ষোভ সমাবেশের মাধ্যমে সর্বপ্রথম সর্বাত্মক শ্রমিক ধর্মঘট পালন করা হয়।
শ্রমিকদের সমাবেশ চলাকালে মালিকদের স্বার্থরক্ষাকারী পুলিশ ও কতিপয় ভাড়াটিয়া গুন্ডা সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে অতর্কিতভাবে গুলি চালিয়ে ৬ জন শ্রমিককে নির্মমভাবে হত্যা ও শতাধিক শ্রমিককে আহত করে। কিন্তু এতেও শ্রমিকরা দমে যায়নি। শ্রমিকদের ইস্পাত কঠিন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কারণে কোনো কোনো মালিক ৮ ঘণ্টা কর্ম সময়ের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। ফলে শ্রমিকরা আরও উৎসাহী ও আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠে এবং সর্বস্তরে ৮ ঘণ্টা কর্ম সময়ের দাবি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২রা মে রবিবারের সাপ্তাহিক বন্ধের দিনের পর ৩ তারিখে ধর্মঘট অব্যাহত রাখে।
ঐ নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আয়োজিত ৪ঠা মে শিকাগো শহরের ‘হে’ মার্কেটের বিশাল শ্রমিক সমাবেশ ডাকা হয়। তাদেরকে ঘিরে থাকা পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি বোমা নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় একজন পুলিশ মারা যায়। পরে আবারও মালিকগোষ্ঠীর গুন্ডা ও পুলিশ বাহিনী বেপরোয়াভাবে গুলিবর্ষণ করে। ফলে প্রায় ১১ জন শ্রমিক নিহত হয় এবং বিপুল সংখ্যক আহত হয়। রক্তে রঞ্জিত হয় ‘হে’ মার্কেট চত্বর। গ্রেফতার করা হয় শ্রমিক নেতা স্পাইস ও ফিলডেনকে।
ঘটনার এখানেই শেষ নয়। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ হত্যা মামলায় শ্রমিক নেতা আগস্ট স্পাইসসহ আট জনকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করে। রীতিমতো ‘চিরুনি অভিযান’ চালিয়ে শিকাগো শহর ও এর আশপাশের এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ফিশার, লুইস, জর্জ এঞ্জেল, মাইকেল স্কোয়াব ও নিভেনসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ শ্রমিক নেতাকে।
আন্দোলনের ফলাফল
পরবর্তীতে শ্রমিকদের এই ন্যায্য আন্দোলনের বিরোধিতাকারী মালিকপক্ষের ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ‘জুরি’ গঠন করে ১৮৮৬ সালের ১৪ জুন শুরু করা হয় বিচারের নামে প্রহসন। একতরফা বিচারের মাধ্যমে ১৮৮৬ সালের ৯ অক্টোবর ঘোষিত হয় বিচারের রায়। রায়ে বিশ্বজনমতকে উপেক্ষা করে শ্রমিক নেতা পারসন্স, ফিলডেন, স্পাইস, লুইস, স্কোয়াব, এঞ্জেল ও ফিশারের বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ প্রদান করা হয় এবং ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর সে আদেশে উন্মুক্ত স্থানে ছয় জনকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
তাদের একজন আগের রাতে জেলখানায় আত্মহত্যা করে। আরেকজনকে পনের বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে আগস্ট স্পাইস বলেছিলেন,
“আজ আমাদের এই নীরবতা তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে।”
শ্রমিক নেতা ও কর্মী হত্যার এ দিবসটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে প্রতিবছর ১লা মে ‘শ্রমিক হত্যা দিবস’ ও ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
দৈনিক ৮ ঘণ্টা কার্য সময় ও সপ্তাহে এক দিন সাধারণ ছুটি প্রদানের ব্যবস্থা করে প্রথম শ্রম আইন প্রণীত হয়। অন্যদিকে নারকীয় এ হত্যাকাণ্ড গোটা বিশ্বের শ্রমিকদের অধিকারে এনে দেয় নতুন গতি। শিকাগো শহরে সৃষ্ট এ আন্দোলন ক্রমশ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। পৃথিবীর সকল শ্রমজীবী মানুষ এ আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়— “দুনিয়ার মজদুর এক হও” স্লোগানটি।
আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস ঘোষণা
১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শত বার্ষিকী উপলক্ষে ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের নেতৃত্বে প্যারিসে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐ বছরই সোশ্যালিস্ট লেবার ইন্টারন্যাশনাল সম্মেলনে জার্মান কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিন ঘোষণা দেন ১৮৯০ সালের পহেলা মে থেকে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালন হবে।
এরপর ১৮৯১ সালের আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ১৯০৪ সালে আমস্টারডামে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস ও শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিশ্বজুড়ে ১লা মে তারিখে মিছিল ও শোভাযাত্রা আয়োজনের আহ্বান জানানো হয়।
বাংলাদেশে শ্রমিক দিবস পালন
বাংলাদেশে প্রথম এ দিবসটি পালিত হয় ১৯৩৮ সালে, যখন এটি ব্রিটিশদের দখলে ছিল। বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশের শ্রমিকরা এখনও প্রকৃত মুক্তি পায়নি যদিও রাজনৈতিক স্বার্থে অনেক অনুষ্ঠান পালন করা হয়।
ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার
শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ধর্ম ইসলাম শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকারের কথা সুস্পষ্টভাবে বিধৃত করেছে। শ্রমিক ও শ্রমজীবী আল্লাহর প্রিয়। বায়হাকী শরীফে বর্ণিত আছে, “শ্রমজীবী আল্লাহর বন্ধু।”
মহান আল্লাহ নিজেই মানুষকে শ্রমজীবী হতে নির্দেশ দিয়েছেন—
“সালাত আদায় হয়ে গেলে জমিনে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (রিযিক) অনুসন্ধান করবে।”
রাসূলুল্লাহ (সা.) জীবিকা অনুসন্ধানকে জিহাদের সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন,
“যদি কেউ তার ছোট ছোট সন্তানের জন্য উপার্জনের চেষ্টা করে তবে সে আল্লাহর রাস্তায় আছে।”
আরও বলা হয়েছে—
“হালাল জীবিকা অনুসন্ধান ফরজ ইবাদতের পরে আরেকটি ফরজ।”
শ্রমের মর্যাদা
রাসূল (সা.) বলেছেন,
“কোনো মানুষের জন্য নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম আহার আর নেই।”
নবীজি (সা.) নিজেও বকরি চরিয়েছেন, ব্যবসা করেছেন, মাটি খনন করেছেন এবং বিভিন্ন শ্রমমূলক কাজে অংশ নিয়েছেন।
পৃথিবীর বিভিন্ন নবীও বিভিন্ন পেশার সাথে জড়িত ছিলেন। যেমন—
আদম (আ.) কৃষিকাজ করতেন
নূহ (আ.) ছিলেন কাঠমিস্ত্রি
ইদরিস (আ.) ছিলেন দর্জি
দাউদ (আ.) ছিলেন কামার
মূসা (আ.) ছিলেন রাখাল
সুতরাং কাজ যত ছোটই হোক ইসলামের দৃষ্টিতে তা সম্মানজনক।
শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার
ইসলাম শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। একজন শ্রমিকের সবচেয়ে বড় অধিকার হলো তার শ্রমের যথাযথ পারিশ্রমিক পাওয়া। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“তোমরা শ্রমিককে তার শরীরের ঘাম শুকানোর পূর্বেই পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।”
ইসলামে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক
ইসলামে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক হবে পিতা-সন্তানের ন্যায়। শ্রমিকের সাথে আন্তরিক আচরণ করা, তাদের সুখ-দুঃখের খোঁজ রাখা এবং সময়মতো প্রাপ্য পরিশোধ করা মালিকের দায়িত্ব।
অন্যদিকে শ্রমিকেরও দায়িত্ব হলো নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার সাথে কাজ সম্পাদন করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
“আল্লাহ ঐ শ্রমিককে ভালোবাসেন যে সুন্দরভাবে কাজ সম্পাদন করে।”
যেসব শ্রমিক কাজে ফাঁকি দেয় বা অসততা করে, ইসলাম তা কঠোরভাবে নিন্দা করেছে।
উপসংহার
এই সুন্দর পৃথিবীর রূপ-লাবণ্যে শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সভ্যতার নির্মাতা এ শ্রেণিটি সবসময়ই উপেক্ষিত, অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিত।
ইসলাম মালিক-শ্রমিকের বৈরী সম্পর্ক দূর করে পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাই প্রয়োজন ইসলামী শ্রমনীতি বাস্তবায়ন এবং শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।
মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন।