নূরুল ইসলাম

শ্রমিকের অধিকার আদায়ে ছাত্র সমাজের ভূমিকা ও করণীয়

বাংলাদেশে বর্তমানে সাড়ে সাত কোটি শ্রমিক রয়েছে| এসকল শ্রমিকদের অধিকাংশই নিম্ম আয়ের মানুষ| যাদের উপর তাদের পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই নির্ভরশীল| ইধহমষধফবংয ষধনড়ৎ সধৎশবঃ ঢ়ৎড়ভরষব ২০২৪/২০২৫ এর তথ্য মতে, দেশে কৃষি ক্ষেত্রে শ্রমিকদের পরিমাণ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে এবং অধিকাংশ শ্রমিক শিল্প ক্ষেত্রে ঝুঁকে যাচ্ছে| ফলে দেশের অর্থনীতির একটি বড়ো পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়| তবে শ্রম শক্তিকে যথাযথ ব্যবহার করে টেকসই উন্নয়ন করার ক্ষেত্রে সরকারি এবং বেসরকারি পদক্ষেপ মোটেও সুখকর নয়| যাইহোক, আমাদের দেশে শ্রমিকেরা তাদের ন্যায্য অধিকার বা ন্যূনতম অধিকার পাওয়ার জন্য আন্দোলন করে আসছে বছরের পর বছর| বিশেষ করে গার্মেন্টস ও চা শ্রমিকদের অধিকার আদায় এবং তাদের ন্যূনতম মজুরির জন্য প্রায় সময়ই রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন করে থাকে| মাঝে মাঝে এই আন্দোলন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষেও রূপ নেয় এবং নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে| এতে দেশের উৎপাদন যেমন ব্যাহত হয় তেমনি বিদেশি বিনিয়োগ এবং রপ্তানি আয়ের উপরও ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব পরে| যদিও এর পেছনে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে| এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, শ্রমিকদের অধিকারের ব্যাপারে যদি আমরা সচেষ্ট না হই তবে এর খারাপ প্রভাব দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের উপর পরবে| যদিও শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করণের জন্য ২০২৬ সালে (৪২নং আইন) সরকার শ্রম আইন প্রণয়ন করেছে| সেখানে শ্রমিকদের অধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ লিপিবদ্ধ থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবহেলা লক্ষ্যণীয়|

শ্রমিকদের নিয়োগ, কাজের পরিবেশ ও ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ আইএলও’র কোনো নীতিমালা মানে না এবং শ্রম আইন লঙ্ঘন করে হর হামেশা| দেশে শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নাই| অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রমিকেরা তার স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও সন্তানের খাদ্য নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত| দেশে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার সাথে সাথে দ্রব্যমূল্যের দাম অনেক বাড়লেও শ্রমিকদের বেতন বাড়াতে গেলে আন্দোলনে নামতে হয়| বাংলাদেশের শ্রমজীবীদের অধিকাংশ স্বল্প শিক্ষিত হওয়ায় নিজেদের অধিকারের ব্যাপারেও সচেষ্ট নয়| ফলে মালিক পক্ষ একটি দুষ্ট সিন্ডিকেট তৈরি করে শ্রমিকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে| আর অধিকাংশ বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠানসমূহের মালিকেরা সরকারি মদদপুষ্ট হওয়ায় সকল সুযোগ সুবিধা তারা নিজেদের মতো করে নিতে পারে|

আমাদের মনে রাখতে হবে, আজকে যারা ছাত্র আগামী দিনে তারা দেশের কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত হবে| দেশে এক চতুর্থাংশ ছাত্র (প্রায় সাড়ে ৪ কোটি) রয়েছে| যাদের সৎ, দক্ষ ও নৈতিক চরিত্রবান হয়ে গড়ে উঠার উপরই নির্ভর করছে একটি দেশের ভবিষ্যৎ| দেশে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে অধ্যয়ন করে একটি অংশ কর্মস্থলে উঁচু পদে অবস্থান করে থাকে| বিশেষ করে বুয়েট, মেডিকেল, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে যারা লেখাপড়া করে তারা মূলত সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হয়ে শ্রমিকদের ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব পালন করেন| এসকল অফিসাররা বা শ্রমক্ষেত্রের মালিকরা যদি শ্রমিকদের অধিকারের ব্যাপারে সচেষ্ট হতো এবং ইসলামের বিধানগুলো জানতে পারতো তবে তা সমাজের জন্য অনেক কল্যাণ বয়ে আনতো| শ্রমিকদের অধিকারের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী?

ইসলামে শ্রমিকদের অধিকারের ব্যাপারে সুষ্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে—
মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক হবে ভাইয়ের মতো| মালিক তার নিজের জন্য যা কল্যাণকর মনে করবে, অধীনস্ত শ্রমিকের জন্যও তা কল্যাণকর মনে করবে| আল্লাহর নবি (সা.) বলেন, ‘যারা তোমাদের কাজ করছে তারা তোমাদেরই ভাই| আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্ত করে দিয়েছেন|’ (বুখারি শরিফ) শ্রমিকের অধিকারের ব্যাপারে আল্লাহর নবি (সা.) এক হাদিসে উল্লেখ করেছেন, ‘তোমরা যা খাবে, তা থেকে তাদের (শ্রমিককে) খাওয়াবে এবং যা পরিধান করবে, তা তাকে পরিধান করতে দেবে|’ (বুখারি ও মুসলিম)

শ্রমিকরাও মানুষ| তাদের শক্তি-সামর্থ্য ও মানবিক অধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখার বিষয়টি উল্লেখ করতে গিয়ে মহানবি (সা.) বলেছেন, ‘মজুরদের সাধ্যের অতীত কোনো কাজ করতে তাদের বাধ্য করবে না| অগত্যা যদি তা করাতে হয়, তবে নিজে সাহায্য করো|’ (বুখারি)

শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত না করার পরিণাম সম্পর্কে মহানবি (সা.) কঠোর বাণী উচ্চারণ করেছেন| তিনি বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আমি কঠিন অভিযোগ উপস্থাপন করব— যে ব্যক্তি কাউকেও কিছু দান করার ওয়াদা করে ভঙ্গ করে, কোনো মুক্ত স্বাধীন ব্যক্তিকে বিক্রয় করে, যে তার মূল্য আদায় করে এবং যে ব্যক্তি অন্যকে নিজের কাজে নিযুক্ত করে পুরোপুরি কাজ আদায় করে নিল, কিন্তু তার মজুরি দিল না, ওরাই সেই তিনজন|’ (মিশকাত)

শ্রমিকদের প্রতি মালিক যাতে সহনশীল থাকে এবং তার ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেয়, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে আল্লাহর নবি (সা.) এক হাদিসে বলেছেন, ‘মজুর-চাকরদের অপরাধ ৭০ বার পর্যন্ত ক্ষমা করে দাও|’ (তিরমিজি)

উন্নয়নশীল দেশে অধিকাংশ মানুষই শ্রমজীবী| তাদের সঠিকভাবে কাজে লাগানো এবং মর্যাদা প্রদান করলে একটি সমাজ উন্নতির স্বর্ণ শিখরে আরোহন করবে| এজন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঘাম শুকানোর আগেই শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিয়ে দাও’ (ইবনে মাজাহ : ২৪৪৩০)| অন্য হাদিসে পারিশ্রমিক ও প্রাপ্য অধিকার নিয়ে টালবাহানাকে অবিচার আখ্যায়িত করা হয়েছে| মহানবি (সা.) বলেন, ‘ধনী ব্যক্তির টালবাহানা অবিচার’ (সহিহ বুখারি : ২২৮৭)| অর্থাৎ সামর্থ্য থাকার পরও মানুষের প্রাপ্য ও অধিকার প্রদানে টালবাহানা করা অন্যায়| আর ঠুনকো অজুহাতে বেতন-ভাতা ও প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা ভয়ংকর অপরাধ| মহানবি (সা.) বলেন, ‘কেয়ামতের দিন আমি তিন ব্যক্তির বিপক্ষে থাকব| আর একজন সে যে কাউকে শ্রমিক নিয়োগ দেওয়ার পর তা থেকে কাজ বুঝে নিয়েছে অথচ তার প্রাপ্য দেয়নি’ (বুখারি : ২২২৭)| শ্রমিকের অধিকার ও মানবিক মর্যাদা এবং মালিকের প্রাপ্য সেবা লাভের এমন ভারসাম্যপূর্ণ শ্রমনীতি একমাত্র ইসলামই দিয়েছে|

শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে ছাত্রসমাজের করণীয়
এটি স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয় যে, শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য ছাত্রদের সচেতনতা জরুরি| কেননা উপমহাদেশ তথা পৃথিবীর বিভিন্ন আন্দোলন ও অধিকার আদায়ে ছাত্রদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ| উদাহরণস্বরূপ বলা যায়— ১৮৪৮ সালে বোহেমিয়ান বিদ্রোহের সময়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ছাত্ররা স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই করে| ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নাৎসি শাসনের বিরুদ্ধে “হোয়াইট রোজ” আন্দোলন করে ফলে দেশে তা ব্যাপক প্রভাব ফেলে| ১৯৬৮ সালে মে মাসে ফ্রান্সের শিক্ষার্থীরা সামাজিক ন্যায় বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে| যা আন্দোলনের রাজনৈতিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে| ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার সোয়েতোর পাবলিক স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীরা বর্ণবৈষম্য বিরোধী আন্দোলন শুরু করে| যার পরবর্তী প্রভাবে সে দেশের শাসন ব্যবস্থাই পরিবর্তন হয়ে যায় এবং নেলসন মেন্ডেলা ক্ষমতায় আসে| এছাড়া উপমহাদেশে ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস| উপরিউক্ত প্রতিটি আন্দোলনই দেশে এবং জাতির ইতিহাসের বাঁক বদলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে| যে সমাজেই বৈষম্য তৈরি হয়েছে সে সমাজের ইতিহাসে ছাত্ররা মাজলুমের হয়ে যখন মাঠে নেমেছে তখনই সমাজ একটি পরিবর্তন দেখতে পেয়েছে| সুতরাং দেশে বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে শ্রমিক শ্রেণিকে মুক্তি দিতে ছাত্ররাই ভূমিকা রাখতে পারবে|

শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত করণে ছাত্ররা নিম্নোক্ত ভূমিকা রাখতে পারে—
১. বঞ্চিত শ্রমিক শ্রেণির অধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে বেশি বেশি একাডেমিক আলোচনা ও সেমিনারের ব্যবস্থা করা|
২. শ্রমিক অধিকার যেসকল সেক্টরে লঙ্ঘিত হচ্ছে তা খুঁজে বের করার জন্য গবেষণাকর্ম চালানো|
৩. শ্রম আইনের ধারাসমূহের ব্যাপারে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতামুলক ক্যাম্পেইন করা|
৪. শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলনের পক্ষে ছাত্রদের সমর্থন জানানো|

পুঁজিবাদি সমাজ ব্যবস্থায় বণিকশ্রেণি সর্বদাই শ্রমিকদের শোষণ করে থাকে এবং তাদের বঞ্চিত করে মালিক পক্ষ সম্পদের পাহাড় গড়ে থাকে| যার ফলে পৃথিবীতে অনেক বড়ো বড়ো সংঘর্ষ ঘটেছে| পৃথিবীর ১ শতাংশ মানুষের কাছে ৬০০ কোটি মানুষের সমান সম্পদ কুক্ষিগত রয়েছে| ফলে ধনীক শ্রেণির কাছে সকল সম্পদ জিম্মি হয়ে আছে এবং সমাজে শ্রেণি বৈষম্য তৈরি হচ্ছে| সম্পদের যথাযথ বণ্টন ছাড়া বা যাকাতভিত্তিক অর্থনীতি চালু করা ছাড়া এ অবস্থা উত্তোরণ সম্ভব নয়| তাই মানবিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে নৈতিকতা সমৃদ্ধ সমাজ কাঠামো গড়ে তুলতে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় এবং সমাজ বিনির্মাণে ছাত্রদের এগিয়ে আসতে হবে| গড়তে হবে ভারসাম্যপূর্ণ বসুন্ধরা|

লেখক : কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির 

সর্বশেষ