আশীষ মাহমুদ

শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা


গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুর। মাথার ঘাম পায়ে পড়ছে অবিরত। ঠিক এই সময় দেখা পেলাম এক বয়োবৃদ্ধ সফেদ লম্বা দাড়ির আবুল হোসেনের। বয়স ৭৫ পেরিয়ে গেলেও রুটি রুজির সন্ধানে তিন চাকার প্যাডেল রিকশা নিয়ে রোজ সকালে বেড়িয়ে পড়তে হয় তাকে। থাকেন রাজধানীর মান্ডাতে। বাড়িতে আর কে আছে জিজ্ঞেস করতেই হাসি দিয়ে বললেন, বুড়ি ছাড়া আপাতত আর কেউ নেই। পরক্ষণে মনে হলো হাসির পেছনে লুকিয়ে আছে এক অমোঘ কালো মেঘ। আবারও জিজ্ঞেস করলাম, ছেলে-মেয়ে নেই?

ভরদুপুরেও রাজধানীর বুকে যেন নীরবতা নেমে আসলো। আবুল হোসেন শুরু করলেন। বললেন তার জীবন সংগ্রামের কথা। কাজ করতেন নিউ মার্কেটের এক কাপড়ের দোকানে। বলতে গেলে পুরো জীবনটাই কেটেছে দোকান কর্মচারী হিসাবে। বয়সের ভারে তাকে চাকরি ছাড়তে হয় অথবা ছাঁটাই হতে হয়েছে।

৩ ছেলে ও ২ মেয়ে নিয়ে তার ছিল সুখের সংসার। বেতন হিসাবে যা পেতেন পুরোটাই ব্যয় করেছেন সন্তানদের পেছনে। চেষ্টা করেছেন ছেলেমেয়েদের পড়ালেখা শিখিয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড় করাতে। নিজের ভবিষ্যতের কখনো ভাবেননি। কোথাও কোনো সঞ্চয় করতে পারেননি। আজ সন্তানরা নিজেদের সংসার নিয়ে ভালো আছে। আবুল হোসেনের দাবি তিনিও ভালো আছেন। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যা আয় হয় তা দিয়ে খুব ভালোভাবে দিন চলে যায়।

আবারও জিজ্ঞেস করলাম, অসুখ হলে কী করেন? কী করি আবার গলির মোড়ের কামালের দোকান থেকে নাপা কিনে খেয়ে ফেলি! আবুল হোসেনের সপাট জবাব।

সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করছি। পরিচিত এক বন্ধুর ফেসবুক স্ট্যাটাস নজর আটকে গেল। ‘কামরাঙ্গীচরে মনির মোল্লা নামে এক নিমার্ণ শ্রমিক ছাদ থেকে বিদ্যুতের লাইনের ওপর পড়ে গিয়ে মারাত্মক আহত হয়েছেন। ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসক বলেছেন তার দুটি হাতই কেটে ফেলতে হবে। চিকিৎসার জন্য প্রচুর টাকার দরকার।’ মনের অজান্তে ঢাকা মেডিকেলের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠলো। সরকারি হাসপাতাল হলেও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরিক্ষা করতে পাশর্^বর্তী বেসরকারি ক্লিনিকের দারস্থ হতে হয়। আবার প্রয়োজনীয় ও দামী ঔষুধগুলো হাসপাতালের ফার্মেসীতে থাকে না।

চোখের সামনে নির্মাণ শ্রমিকের অসহায়ত্ব ভেসে উঠলো। কীভাবে কী করবে, বাকি জীবন কীভাবে অতিবাহিত করবে ভাবতেই গা শিউরে উঠলো।

প্রতিদিনের পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠা বা টেলিভিশনের স্ক্রলে প্রায় দেখি এই রকম অসংখ্য মানবিক আবেদন। কেউ মনির মোল্লার মত নির্মাণ শ্রমিক, কেউ পরিবহন শ্রমিক, কেউবা দিনমজুর। জানি না এসব মানবিক আবেদন বা সোশ্যাল মিডিয়ার স্ট্যাটাসে কয় জন এগিয়ে আসে। আদৌ আসে কি না কিংবা এসব মানবিক আবেদন মানুষ দেখে কি না সেই প্রশ্ন করতে চাই না।

ফিরে আসি মনির মোল্লার কাছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম তখন মনির মোল্লার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিলেন। তার স্ত্রী দুর্ঘটনার পরপরই সন্তানের জন্ম দেন। শশুরবাড়ির আত্মীয় স্বজন দেখলো মনির মোল্লা আর কোনো দিন স্বাভাবিক কর্মে ফিরতে পারবে না। তাই তারা নবজাতক সন্তানকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে এবং স্ত্রী কে তার কাছ থেকে নিয়ে যায়।

নাজমা বেগম। নদী ভাঙনের পর মায়ের সাথে ঢাকায় চলে আসেন। আশ্রয় নেন ঢাকা শহরের এক বস্তিতে। কর্মের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন মা-মেয়ে। মা পাশের এক বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ নেন। মেয়ের চাকরি হয় এক গার্মেন্টসে। এভাবে মা-মেয়ের আয়ে সংসার চলে যাচ্ছিল। প্রকৃতির নিয়মে নাজমার বিয়ের বয়স হয়। বিয়েও হয়ে যায় এক দিনমজুরের সাথে। বিয়ের পর নাজমা যথারীতি গার্মেন্টসের চাকরি চালিয়ে যায়। এক পর্যায়ে সে বুঝতে পারে অন্তঃসত্ত্বা। প্রথম তিন-চার মাস চাকরি চালিয়ে গেলেও পরবর্তীতে আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। ছোট গার্মেন্টস। তাদের এখানে মাতৃত্বকালীন ছুটি বলতে কিছু নেই। ফলে বাধ্য হয়ে তাকে চাকরি ছাড়তে হয়।

ঠিক এই সময় নাজমার জীবনে নেমে আসে অমানিশার অন্ধকার। তার দিনমজুর স্বামী কর্মস্থলে হঠাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। স্বামীর মৃত্যুতে সংসারের উপার্জন শূন্যতে নেমে আসে। এই কঠিন দুর্দিনে নাজমা কী করবেন ভেবে পান না!

২০১৯ সালে চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস সারাবিশ^কে থমকে দিয়েছিল। মানুষ কাজকর্ম রেখে বাড়িতে বন্দিরমত জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস সনাক্ত হয় মার্চ ২০২০ এ। মহামারী রুখতে সরকার লক ডাউন ঘোষণা করে। স্থবির হয়ে পড়ে দেশের শ্রম অঙ্গন। শ্রমজীবী মানুষের জীবনে যা এক দুর্বিষহ অন্ধকার। বিশেষত যখন মোট শ্রমজীবীর দুই-তৃতীয়াংশ অনানুষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। যারা দিনে এনে দিনে খায়। লক ডাউনে এসব মানুষরের সামনে উপোষ থাকা ছাড়া কোনো গতি ছিল না। যদিও লক ডাউনের শুরুতে সরকার বা দানবীর, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন হত দরিদ্র মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছে। তা সত্তে¡ও বলতে হয় এসব ছিল প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য।

করোনা মহামারী আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছে মানুষ কত অসহায়। বিশেষত যাদের ঘরে দুই পয়সা সঞ্চয় নেই, এক শতাংশ থাকার জায়গা নেই তাদের জীবনকে মানুষের জীবন বলা যায় না। লক ডাউন যত দীর্ঘ হয়েছে ততই এসব মানুষের হাহাকার ও উপোষের চিৎকার বেড়েছে। দুই মুঠো অন্নের জন্য তারা কঠিন শর্তে সুদের ওপর টাকা ঋণ নিয়ে জীবন কোনো মতে চালিয়ে গেছে।

করোনা পরবর্তীতে জীবন স্বাভাবিক হলেও এসব মানুষরা আজও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। আজও বহু শ্রমিক তার করোনা সময়কালীন ঋণ শোধ করতে পারেনি। তাদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে চক্রবৃদ্ধি সুদের হার!

গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে করোনার সময়ে বহু সন্তান তার বয়োবৃদ্ধ পিতামাতাকে অভাবের তাড়নায় বনে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসছে। বহু মানুষ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। এক প্রতিবেশী অপর প্রতিবেশীর বাসায় যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছে। মানুষ ভুলে গিয়েছে সামাজিক মূল্যবোধ ও দায়-দায়িত্ব।


‘সামাজিক নিরাপত্তা’ শব্দ যুগলটি নতুন কোনো শব্দ নয়। বরং আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রে সামাজিক নিরাপত্তা অবিচ্ছেদ অংশ। আরও গভীরভাবে বলতে গেলে প্রাচীন রাষ্ট্রগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা পদ্ধতির প্রচলন ছিল। হয়ত আধুনিক সময়ের মত কাগুজে কলমে সুসংগঠিত ছিল না কিন্তু বাস্তবিকভাবে সামাজিক নিরাপত্তা ছিল। প্রাচীন মিসর, গ্রিস, রোম, চীন, ভারতের ইতিহাসে সামাজিক নিরাপত্তার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। আল্লাহর নবী মোহাম্মদ (সা.) মদিনাতে যে রাষ্ট্র ব্যবস্থার সূচনা করেছিলেন, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি ছিল মানুষের কল্যাণ যা সামাজিক নিরাপত্তাকে আবৃত করেছিল।

শিল্প বিপ্লবের পর সামাজিক নিরাপত্তার চাহিদা ও পরিধি বেড়ে যায় বহুগুণ। ইংল্যান্ডের দরিদ্র জনগণকে সহায়তার জন্য ১৫৩১ ও ১৬০১ সালে দরিদ্র আইন করা হয়েছিল। জার্মানির চ্যান্সেলর অটো ভন বিসমার্ক ১৮৮৩ সালে সামাজিক নিরাপত্তার রূপরেখা প্রদান করেন। ১৯৩৫ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সামাজিক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করেন। বাংলাদেশের সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী (২০১১) এর মাধ্যমে ‘সামাজিক নিরাপত্তা’ ১৫ (ঘ) অনুচ্ছেদ যুক্ত হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা কী তা আগে বুঝতে হবে। বিখ্যাত সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ ডবিøউ. এ. ফ্রিডল্যান্ডারের মতে, ‘অসুস্থতা, বেকারত্ব, উপার্জনকারীর মৃত্যু, বার্ধক্য কিংবা নির্ভরশীলদের অক্ষমতা এবং দুর্ঘটনা ইত্যাদি যখন ব্যক্তি তার নিজের চেষ্টায় মোকাবিলা করতে পারে না তখন সামাজিক আইনের মাধ্যমে যেসব প্রতিরক্ষামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় তাকেই সামাজিক নিরাপত্তা বলে।’

আবার স্যার উইলিয়াম বিভারেজের মতে, ‘বেকারত্ব, অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা, বৃদ্ধ বয়সে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ, পরিবারের উপার্জনশীল ব্যক্তির মৃত্যু অথবা জন্ম, মৃত্যু ও বিয়ের সময় অস্বাভাবিক ব্যয় নির্বাহের জন্য কোনো পরিবারের উপার্জন বা আয়ের পথ বন্ধ হলে যে কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের উপার্জন বা আয়ের নিশ্চয়তা দান করা হয় তাই সামাজিক নিরাপত্তা।’

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে, সামাজিক নিরাপত্তা হল এমন একটি নিরাপত্তা যা যথোপযুক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমাজ কর্তৃক প্রদান করা হয়, যখন মানুষ বিশেষ বিপদাপদের সম্মুখীন হয়। এসব বিপদাপদ এমনি আকস্মিক দুর্ঘটনা যে স্বল্প আয়ের ব্যক্তিবর্গ স্বীয় সামর্থ্য ও উদ্যোগের দ্বারা মোকাবিলা করতে অপরাগ।’

বাংলাদেশের সংবিধানে সামাজিক নিরাপত্তাকে সংজ্ঞায়িত করেছে এভাবে, ‘সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্যলাভের অধিকার।’

মোদ্দাকথা সামাজিক নিরাপত্তা হলো আয়ের উৎস বন্ধ হলে সাহায্য পাওয়ার অধিকার।


সামাজিক নিরাপত্তা এবং শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা কি আলাদা কিছু? বাংলাদেশের বাস্তবতায় এদেশে সামাজিক নিরাপত্তা অর্থ হওয়া উচিত ‘শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা’। কেননা যখন দেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ শ্রমজীবী তখন বুঝতে আর বাকি থাকে না এদেশে কার বেশি সামাজিক নিরাপত্তা প্রয়োজন।

সরকার সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানের লক্ষ্যে অন্তত দেড় শতাধিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তবে বাস্তব সত্য হলো এসব কর্মসূচি মোটাদাগে শ্রমবান্ধব নয়। বরং আরও বাড়িয়ে বলা যায় অতীতের সমাজ সেবা খাতে সরকার যা ব্যয় করতো আজকে তা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আজকে সরকার যে সব ব্যয় করছে তার ফল দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবী মানুষরা পাচ্ছে না।

২০১৫ সালে সরকার কর্মসূচি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হাতে নিয়েছে। ৭ দফা কর্মসূচি যা রাখা হয়েছে তা দিয়ে গ্রামের প্রান্তিক মানুষ যৎ সামান্য উপকৃত হচ্ছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আজও সরকার বাস্তবায়ন করতে পারেনি। গার্মেন্টস সেক্টরে সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি।

সরকার আইন করে জনগণের জন্য তবে দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের দেশে আইন যত কঠিন আইনের বাস্তবায়ন ততই হালকা। সামাজিক নিরাপত্তা তার একটি উদাহরণ।


শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সরকার-মালিকপক্ষকে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এর বিকল্প কিছু হতে পারে না। শ্রম আইনে শ্রমিকের সুরক্ষার কথা বলা আছে; এই সুরক্ষা তখনই বাস্তবায়িত হবে যখন শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। বাংলাদেশ থেকে কম আয়ের দেশ কম্বোডিয়া যেখানে তাদের শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে সেখানে আমরা কেনো পারব না? একটু সদিচ্ছাই পারে দেশের শ্রমিকদের সুরক্ষা দিতে।

আমাদের মোট শ্রমিকের ৮৮ ভাগ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। মানুষের বয়স যত ফুরিয়ে আসে ততই তার কর্মক্ষমতা কমতে থাকে। কমতে থাকে তার আয়। একটি পর্যায়ে তারা আয় শূন্য হয়ে পড়ে। তাই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা জীবনের শেষ দিনগুলোতে নিদারুণ কষ্ট ভোগ করে। অপরপক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের বয়স ৩৫-৪০ হলে অনেকে কাজ হারানোর ঝুঁকিতে থাকে। কারণ মালিকরা মনে করে তাদের দ্বারা উৎপাদনশীলতা কমছে। ফলে এ খাতের শ্রমিকরাও উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় দিন অতিবাহিত করে।

মানুষের জীবনের গতি কখন কোন দিক মোড় নেয় তা আগে থেকে বলা যায় না। বিশেষত যখন মানুষের জন্ম-মৃত্যু মানুষের হাতে নেই। দুর্ঘটনা-প্রাণহানি আগে থেকে বলে দেওয়া সম্ভব না। এমন অবস্থায় শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একান্তই জরুরি।

আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে পরিষ্কার দৃষ্টিভঙ্গি। সরকারের ভাষ্যমতে জনগোষ্ঠীর ৩৯ শতাংশ, শিশুদের ২৯ শতাংশ, গর্ভবতী নারীদের ২১ শতাংশ, আহত ১৮ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা পান। এই ভাতার দরকার আছে। তবে আমাদেরকে এখন শ্রমজীবী মানুষদের কথা ভাবতে হবে। সরকার বলছে, কর্মস্থলে আহত ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শ্রমিক আহত ভাতা পান। এটা মেনে নিয়ে বলতে হচ্ছে শ্রমিকদের নিরাপত্তায় দেশ অনেক পিছিয়ে আছে। শ্রমিকদের বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে রাষ্ট্রের কর্তাদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে চিন্তা করতে হবে।

অসুস্থ শ্রমিক, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী শ্রমিক, শ্রমজীবী গর্ভবতী নারী ও বেকার শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এরা যখন আয় শূন্য হয়ে পড়েন; তখন তারা বিচলিত হয়ে পড়েন। আমরা চাই শ্রমিকরা বিপদে বিচলিত যেন না হন সে জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা।

সরকার জিডিপির ৩ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করছে। প্রয়োজনে এইখাতে বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে। সরকার চাইলে সকল সমস্যার সমাধান করতে পারে। মালিকপক্ষকে সাথে প্রতিটি শ্রমিকের জন্য একটি ফান্ড গঠন করতে পারে। যেখানে শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষার জন্য মালিকরা প্রতিমাসে টাকা জমা দিবে। আর অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য সরকার তার রাজস্ব থেকে টাকা জমা রাখবে। দেশের প্রতিটি শ্রমিকের একটি আইডি কার্ড থাকবে। প্রয়োজনের সময় সে কার্ড ব্যবহার করে শ্রমিক তার প্রয়োজন মিটাবে।


সরকার সকল নাগরিকের জন্য ইউনিভার্সাল পেনশন চালু করতে চাচ্ছে। সরকারের যেকোনো শ্রমবান্ধব উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। কম্বোডিয়ার মত দেশ শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। মালয়েশিয়া তাদের দেশের শ্রমিকদের জন্য মালিকদের নিকট থেকে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা সংগ্রহ করে। খোঁজ নিলে জানা যাবে পৃথিবীর বহুদেশ হয়ত অন্য উপায়ে শ্রমিকদের সুরক্ষা দিচ্ছে।

এসব দেশ কীভাবে শ্রমিকদের সুরক্ষা দিচ্ছে তার পদ্ধতি জেনে আমাদের দেশের উপযোগী পদ্ধতি প্রচলন করা সময়ের দাবি। শ্রমিকরা সুরক্ষিত থাকলে দেশের অর্থনীতি সুরক্ষিত থাকবে। দেশ এগিয়ে যাবে তার কাক্সিক্ষত পথে।

যে পথে দেখা মিলবে না আবুল হোসেন, মনির মোল্লা, নাজমা বেগমদের। আমরা দেখতে চাই আবুল হোসেনের মত বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিরা শেষ জীবন কাটাবেন নাতিদের সাথে আনন্দ উল্লাসে। মনির মোল্লার কোলে তার সন্তান খেলা করবে। নাজমা বেগম নিশ্চিতভাবে সন্তানকে গড়ে তুলবেন আপন আলোতে। পত্রিকা দুঃসংবাদের থেকে সুসংবাদ অনেক বেশি আলো ছড়াবে।

একই সাথে সরকারকে বলতে চাই আপনারা দেশকে কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চান বলে প্রতিনিয়ত শুনছি। কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিকের নাম ধরে ধরে কল্যাণ নিশ্চিত করে থাকে। তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে যা অতি সহজ। সরকারের প্রশাসন আছে, ক্ষমতা আছে। সরকার একটু সদিচ্ছাসহ উদ্যোগ নিলে সফলতা আসবেই। সুতরাং সরকার ও রাষ্ট্রযন্ত্র এদেশের মেহনতি শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে কাজ করবে, এটাই শ্রমজীবী মানুষদের একমাত্র প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
ইমেইল : mahmudashis@yahoo.com

সর্বশেষ