ইসলাম মূলত একটি প্রচারমূলক জীবন বিধান। প্রচারের উপরই এর ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। ইসলামের ধর্মীয় ও পার্থিব শক্তির মূল উৎসই হচ্ছে কল্যাণের দিকে আহ্বান জানানো তথা সৎকাজের আদেশ দান ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখা। এর উপরই ইসলামের গোটা জীবনী শক্তির নির্ভরতা। আল্লাহর বান্দাদেরকে তার বন্দেগীর দিকে দাওয়াত দেওয়ার কাজ এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, কোনো অবস্থাতেই কোনো মুসলমানের পক্ষে সে কাজ বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। দাওয়াতের এ কাজ একজন মুসলমানের জীবন ও তার ব্যক্তিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সে যেখানেই থাকুক এবং যে কাজই করুক সব অবস্থাতেই সে প্রথমত আল্লাহর পথের আহ্বায়ক, অতঃপর অন্যকিছু।
সারা দুনিয়া জুড়ে আজ মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্ব চলছে। কোথাও কোনো ব্যক্তি, কোথাও কোনো দল-আদর্শ বা কোনো ব্যবস্থার নামে সাধারণ মানুষের সর্বপ্রকার অধিকারকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এই হঠকারীতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে সাধারণ মানুষের মুক্তি আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করার মধ্যেই রয়েছে নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের প্রকৃত মুক্তি।
শ্রমিকের পরিচয়
সাধারণত যেকোনো কাজ করতে গেলেই শ্রমের দরকার হয়। এ হিসেবে সব মানুষকেই শ্রমিক বলা যায়। তবে সাধারণত ঐসব ব্যক্তিদেরকেই শ্রমিক বলা হয়, যারা অর্থের বিনিময়ে শ্রম বিক্রি করে। এছাড়া শ্রমিক বলতে এমন ব্যক্তিদের বুঝায় যারা মজুরির বা বেতনের বিনিময়ে অন্য ব্যক্তিদের অধীন কিংবা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিল্প কারখানায় কর্মকর্তাদের অধীনে শ্রমিক-কর্মচারী হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ২ (৬৫) ধারায় বলা হয়েছে, ‘যিনি মজুরি বা অর্থের বিনিময়ে কোন দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক, কারিগরী, ব্যবসা উন্নয়নমূলক অথবা কেরানীগিরির কাজ করার জন্য নিযুক্ত হন তিনি শ্রমিকের আওতাভুক্ত। তবে প্রশাসনিক তদারকি কর্মকর্তা বা ব্যবস্থাপনামূলক কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি শ্রমিকের আওতাভুক্ত নন।’
মোদ্দাকথা শ্রমের বিনিময়ে যিনি মজুরি গ্রহণ করেন অথবা মজুরির বিনিময়ে যিনি শ্রম দেন তিনিই শ্রমিক।
শ্রমিক ময়দানের গুরুত্ব
বাংলাদেশ একটি জনবহুল ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর ত্রৈমাসিক (জানুয়ারি-মার্চ) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ এর তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে মোট শ্রম শক্তির সংখ্যা ৭ কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজার। এর মধ্যে পুরুষ ৪ কোটি ৮২ লাখ ও নারী ২ কোটি ৫৪ লাখ। কৃষিতে নিয়োজিত শ্রমিক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৩ কোটি ১৯ লাখ ৪০ হাজার। শিল্পখাতে ১ কোটি ২২ লাখ ৫০ হাজার এবং বিভিন্ন সেবা খাতে নিয়োজিত শ্রমিক জনগোষ্ঠী ২ কোটি ৬৯ লাখ ১০ হাজার। অবশিষ্ট শ্রমিকরা বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। এ সকল শ্রমিকদের বেশিরভাগ প্রাপ্ত বয়স্ক। যা দেশের ১২ কোটি ভোটারের মধ্যে ৬০ ভাগ। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বলতে যাদেরকে বুঝায় তারা মূলত শ্রমিক শ্রেণি। দেশের যেকোনো পরিবর্তন উত্থান-পতন কিংবা কোনো আদর্শকে বিজয়ী করতে হলে শ্রমিক ময়দানের এ বিশাল জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা আবশ্যক।
ইতিহাস থেকে জানা যায় কার্ল মার্ক্স-লেলিন সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে বিশ^ব্যাপী কায়েমের লক্ষ্যে শ্রমিক শ্রেণির উপর ভর করেছিলেন। তারা শ্রমিক আন্দোলনকে শ্রমিক শ্রেণির অধিকার আদায়ের আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করলেও প্রকৃতপক্ষে শ্রমিক মেহনতি শ্রেণিকে সমাজতন্ত্রের আদর্শে গড়ে তোলার মাধ্যম হিসেবে ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ আন্দোলনকে ব্যবহার করে। শোষকদের হাত থেকে শাসন ও সম্পদ কেড়ে নিয়ে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে ভেবে সমাজতন্ত্রের প্রতি প্রচুর মানুষ উৎসাহী হয়ে উঠে। এ সুযোগে শ্রমিকদের সংগঠিত করে বিংশ শতাব্দীতে চীন, রাশিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন, কিউবা, লাউস ভেনিজুয়েলা, উত্তর কোরিয়া, আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, আফগানিস্তান, মায়ানমার গাম্বিয়াসহ ৩০টিরও বেশি দেশে কমিউনিস্ট বিপ্লব সংগঠিত হয়েছে। এ সকল বিপ্লবের মূল শক্তি ছিলো শ্রমজীবী মানুষ।
ইসলামের বিজয় ইতিহাস পড়লে জানা যায় ১৫০০ বছর আগে আরবে রাসুল (সা.) এর ইসলামি সমাজ বিপ্লবে সে সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষ যেমন রাখাল, গোলাম ও কৃতদাসের ভূমিকা অন্যদের চেয়ে ঈর্ষণীয় ছিল। শত জুলুম-নির্যাতন ও প্রলোভন তাদেরকে রাসুল (সা.) এর বিপ্লবী আন্দোলন থেকে পিছু হঠাতে পারেনি। সুতরাং কোন আদর্শকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে শ্রমিক জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশকে সে আদর্শ বাস্তবায়নের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ করতে পারলে সে আদর্শকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করা অনেকটা সহজ হয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের এ জমিনে আল্লাহর দ্বীন বিজয়ের পতাকাকে উড্ডহীন করার লক্ষ্যে শ্রমিক ময়দানকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে শ্রমিক জনগোষ্ঠীর মাঝে দাওয়াত সম্প্রসারণের সঠিক পন্থা নির্ধারণ করে সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালানো জরুরি।
দাওয়াতের তাৎপর্য
দাওয়াত শব্দটি আরবি ‘দায়া’ শব্দ থেকে উৎপন্ন হয়েছে। ‘দাওয়াত’ মানে আহ্বান করা বা ‘ডাক’ বা আমন্ত্রণ জানানো। প্রত্যেক আন্দোলন বা সংগঠনই মানুষকে নির্দিষ্ট কোন কথার দিকে আহ্বান করে। ইসলামি পরিভাষায় ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির জন্য মানবজাতিকে আল্লাহর দিকে তথা ইসলামি জীবন বিধান পালনের আহ্বানকে দাওয়াত বলা হয়।
মানুষ সৃষ্টির শুরু থেকে যুগে যুগে নবি রাসুলগণ মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছেন। সকল নবি-রাসুলগণ মানুষের সামনে এক ও অভিন্ন দাওয়াত পেশ করেছেন। আল্লাহ বলেন, “এবং আমি প্রত্যেক জাতির কাছে রাসুল প্রেরণ করেছি তারা এই বলে মানুষকে আহ্বান করেছেন যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত (দাসত্ব) করবে এবং তাগুত তথা খোদাদ্রোহী শক্তিকে পরিত্যাগ করব” (সুরা নহল : ৩৬)
আল্লাহর পথে দাওয়াতের কাজ ছিল আম্বিয়াদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। আম্বিয়াদের পরে খোলাফায়ে রাশেদীন তারপর তাবেয়ীন ও উলামায়ে কেরামগণ এ দায়িত্ব পালন করেছেন। ঈমানের পর এ কাজটি হল সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম কাজ। এ দাওয়াতি কাজের ফলে দাওয়াত প্রদানকারী নিজের জীবনকে নির্ভুল করে নেওয়ার সুযোগ পায়। এই কাজ আরম্ভ করার সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য দূরবীক্ষণ ও সন্ধানী আলো তার জীবন ও চরিত্রের দিকে উত্তেলিত হয়। ফলে দায়ীর নিজের জীবনে ত্রুটি-বিচ্যুতি কিছু থাকলেও বিনা পয়সার সংশোধনী প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিজের জীবনকে নিখুঁত ও নির্ভুল করে তুলতে পারে।
কারো দাওয়াতের মাধ্যমে কোনো পথহারা মানুষ যদি সঠিক পথের সন্ধান লাভ করে তবে তার সমগ্র জীবনের নেক আমলের সাওয়াব আমলকারী যেমন পাবে তেমনি দাওয়াত দানকারীও পেতে থাকবে। এভাবে পরবর্তীতে যত ব্যক্তি হেদায়েত লাভ করবে প্রথম দায়ী সকলের সমান সওয়াব ও কল্যাণ লাভ করবে। এই সাওয়াব বাড়তে থাকবে জ্যামিতিক হারে। রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি হিদায়াতের দিকে আহ্বান করে আর যে ব্যক্তি তা অনুসরণ করে সে সমপরিমাণ পুরস্কার পাবে তাদের পুরস্কার কোন প্রকার কর্তন করা হবে না।” (সহিহ মুসলিম)
দাওয়াতের দায়িত্বের কারণে উম্মতে মুহাম্মদীকে (সা.) সকল উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, “তোমরাই সকল উম্মতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ তোমাদেরকে বের করা হয়েছে মানবজাতির প্রয়োজনে। তোমরা আল্লাহতে অবিচল ঈমান পোষণ করবে। আর মানুষদের ন্যায়ের আদেশ দেবে ও অন্যায়কে উৎখাত করবে।” (সুরা আলে ইমরান : ১০)
শ্রমজীবী মানুষের প্রতি আমাদের দাওয়াত
ইসলামের দাওয়াত সকল মত ও পথের মানুষের জন্য। পবিত্র কুরআনে সমস্ত মানুষকে সত্য দ্বীন গ্রহণের আহŸান জানানো হয়েছে। দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিদের মধ্যে বা কোন শ্রেণি পেশার মধ্যে পার্থক্য সূচিত করা অর্থাৎ কারো প্রতি খুব আগ্রহ প্রকাশ এবং কাউকে অবজ্ঞা করা কুরআন বিরোধী। দাওয়াতের দৃষ্টিতে সত্যানুসন্ধিৎসু প্রত্যেক ব্যক্তিই গুরুত্বের অধিকারী সে যতই দুর্বল, প্রভাবহীন ও অক্ষম হোক না কেন।
যে লোকের সত্যানুরাগ নেই সামাজিকতা কিংবা পদ মর্যাদার দিক দিয়ে সে যতই উচ্চ সম্মান ও মর্যাদাবান হোক না কেন ইসলামের দৃষ্টিতে সে একেবারেই গুরুত্বহীন। অপরদিকে যে লোক সত্যের পথে অগ্রগামী হতে প্রস্তুত সে যে শ্রেণি পেশার লোক হোক না কেন কিংবা সামাজিকতার দিক থেকে তার অবস্থান যতই নিচে হোক না কেন ইসলামের দৃষ্টিতে তার গুরুত্ব অত্যাধিক।
একবার রাসুল (সা.) মক্কার কতিপয় সমাজপতিদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলাপ করছিলেন, তখন হযরত ইবনে মাকতুম (রা.) নামে একজন অন্ধ ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে রাসুল (সা.) কাছে কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বাক্যালাপ চালু রাখার ব্যঘাত সৃষ্টি হওয়ায় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ প্রসঙ্গে আয়াত নাজিল করলেন, “বেজার মুখ হলো এবং অনাগ্রহ দেখালো এ জন্য যে, সেই অন্ধ ব্যক্তি তার নিকট এসেছে। তুমি কি জানো সে হয়তো পরিশুদ্ধ হতো কিংবা উপদেশ গ্রহণ করতো এবং উপদেশ দান তার জন্য কল্যাণকর হত? যে লোক বেপরোয়াভাব দেখায় তার প্রতি তুমি লক্ষ্য দিচ্ছো অথচ সে যদি পরিশুদ্ধ না হয় তবে তোমার উপর এর দায়িত্ব কি? আর যে লোক তোমার নিকট দৌড়ে আসে এবং সে ভয়ও করে তুমি তো তার প্রতি অনীহা প্রদর্শন করছো।” (সুরা আবাসা : ১-১০)
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন, “আমি সংকল্প করেছিলাম, যাদেরকে পৃথিবীতে লাঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করবো, তাদেরকে নেতৃত্ব দান করবো, তাদেরকেই উত্তরাধিকারী করবো। পৃথিবীতে তাদেরকে কর্তৃত্ব দান করবো এবং তাদের থেকে ফেরাউন, হামান ও তার সৈন্যদেরকে সে সবকিছুই দেখিয়ে দেবো, যার আশঙ্কা তারা করতো।” (সুরা আল কাসাস : ৫-৬)
সুতরাং সমাজের সুবিধা বঞ্চিত ও দুর্বল মানুষগুলো অনেক বেশি শক্তির অধিকারী। পরিকল্পিত দাওয়াত প্রদানের মাধ্যমে বিশাল এ শক্তিকে আদর্শিক আন্দোলনের দাওয়াতে বলয়ে নিয়ে আসার বিকল্প নেই।
শ্রমজীবী মানুষের প্রতি আমাদের দাওয়াত
১.জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামের অনুসরণ, রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও ইসলামি শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাধারণ শ্রমিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনুভূতি জাগ্রত করণ।
২.শ্রমজীবী মানুষের মাঝে প্রতিষ্ঠিত জাহেলী ধ্যান-ধারণার অপনোদন, চিন্তার বিশুদ্ধকরণ, মন-মগজ সংশোধন ও পরিবর্তন সাধন।
৩.শ্রমিক ময়দানে ঈমানদার, সৎ, যোগ্য ও আল্লাহভীরু নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
৪.কল্যাণমূলক ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আগ্রহী শ্রমিকদেরকে ঐক্যবদ্ধ করা।
৫.শ্রমিকদের ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করার মনোভাব সৃষ্টি করা।
৬.শ্রমজীবী মানুষকে খাঁটি মুমিন হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে পরকালীন সফলতা অর্জন।
শ্রমিক ময়দানে দাওয়াতের কর্মপন্থা
শ্রমিক ময়দানে দাওয়াতের কর্মপন্থা নির্ধারণে ২টি দিককে নিয়ে প্রধানত গুরুত্ব দিতে হবে
১. সাংগঠনিক দিক, ২. ব্যক্তিগত দিক
দাওয়াতের সম্প্রসারণে সাংগঠনিক কর্মপন্থা
শ্রমিক ময়দানে দাওয়াত সম্প্রসারণে সাংগঠনিকভাবে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
১.সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ
দাওয়াতের ক্ষেত্রে সাংগঠনিকভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। সংগঠনকে শ্রমজীবী মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য করতে পরিকল্পিতভাবে তাদের নিকট দাওয়াত পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে ভূমিকা রাখতে হবে। পরিকল্পনা গ্রহণ তৃণমূল পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত পরিসংখ্যানমূলক হতে হবে। স্ব-স্ব সাংগঠনিক এলাকায় সম্ভাব্য শ্রমিক সংখ্যা নির্ধারণ পূর্বক দাওয়াত সম্প্রসারণের সংখ্যাতাত্তি¡ক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
২.পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভূমিকা
সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত সকল জনশক্তি ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনায় সম্পৃক্ত করা দাওয়াত সম্প্রসারণের অপরিহার্য দিক। প্রত্যেক জনশক্তিকে মাসিক দাওয়াতি টার্গেট নির্ধারণ করার পাশাপাশি যৌথভাবে দাওয়াতি গ্রুপ পরিচালনার মাধ্যমে নিজ নিজ এলাকায় অবস্থানরত শ্রমিকদের নিকট দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য ভূমিকা রাখতে হবে।
৩.সহজ ভাষায় দাওয়াত উপস্থাপন
মানুষের ক্ষমতা সীমিত। যেকোনো বিষয় গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সকল মানুষের যোগ্যতা ও ধারণ ক্ষমতা সমান নয়। কেউ কোনো জিনিস সহজে গ্রহণ করতে পারে, অন্যজনের পক্ষে তা সম্ভব হয় না। ফলে ইসলামকে শ্রমজীবী মানুষের নিকট সহজ বোধ্য গ্রহণযোগ্য ও আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, “আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না।” (সুরা আল বাকারা : ১৮৫)
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমি কুরআনকে সহজ করে নাজিল করেছি, উপদেশ নেওয়ার কেউ আছ?” (সুরা কাসাস : ১৮)
রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা সহজনীতি ও আচরণ অবলম্বন কর, কঠোর নীতি অবলম্বন করো না।
৪.সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা
শ্রমজীবী মানুষ সমাজের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী। নানান সমস্যায় জর্জরিত অবস্থায় তারা প্রাত্যহিক জীবন পরিচালনা করে থাকে। সেবামূলক কাজের মাধ্যমে তাদের সহজেই দাওয়াতি বলয়ে নিয়ে আসা সম্ভব। সেবামূলক কাজের অংশ হিসেবে শ্রমিকদের চিকিৎসা সেবা প্রদান, মেডিকেল ক্যাম্প, মাতৃত্বকালীন প্রসূতি সেবা, নবজাতককে উপহার, দাফন-কাফনে সহযোগিতা, কর্ম অক্ষম শ্রমিকদের সহযোগিতা, আইনি সহযোগিতা, পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রদান, ঈদ সামগ্রী, ইফতার সামগ্রী বিতরণসহ নানাবিধ কার্যক্রম যার যার অবস্থার আলোকে গ্রহণ করা ।
৫.শ্রমিকদের প্রয়োজন পূরণে ভূমিকা
দাওয়াত সম্প্রসারণে দায়ীকে শ্রমিক সেবা ও শ্রমিকদের প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসতে হবে। অনেক দায়ী দাওয়াতের কাজ করতে গিয়ে সর্বদা দ্বীনের কথাই বলে থাকেন, মানুষের সমস্যা জানার চেষ্টা করেন না কিংবা জানলেও তার সমাধানে এগিয়ে আসেন না। বিপদে শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে না পারলে সাধারণ শ্রমিকের সাথে দায়ীদের দূরত্ব বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে সকল ক্ষেত্রে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা সম্ভব না হলে উত্তম চরিত্র দিয়ে হলেও তার পাশে দাঁড়াতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমরা যদি তোমাদের অর্থ দিয়ে মানুষের নিকট পৌঁছাতে না পার তাহলে অন্তত তোমাদের চরিত্র নিয়ে পৌঁছার চেষ্টা কর।” (তাবরানী)
৬.শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলনে সম্পৃক্ততা
শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার মাধ্যমে শ্রমিকদের মনজগতে সহজেই স্থান করা যায়। যা দাওয়াতি কাজের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে থাকে।
৭.সাধারণ শ্রমিকদের অংশগ্রহণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ
শ্রমিক জনগোষ্ঠীর নিকট দাওয়াত পৌঁছানোর লক্ষ্যে ব্যাপক ভিত্তিক সাধারণ সভা, দাওয়াতি সভা, তাফসির মাহফিল, সিরাতুন্নবী (সা.) মাহফিল, ইফতার মাহফিল, ইসলামি দিবস পালন, বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান, দাওয়াতি সভা, ফলচক্র, সামষ্টিক ভোজ প্রভৃতি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।
৮.দাওয়াতি উপকরণ প্রকাশ ও বিতরণ
দাওয়াত প্রদানের মাধ্যম হিসেবে দাওয়াতি উপকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। দাওয়াতি কাজের মাধ্যমে হিসাবে পরিচিতি, লিফলেট, পোস্টার, ক্যালেন্ডার, স্টিকার, আকর্ষণীয় বই পুস্তক, ইসলামি শ্রমনীতি বিষয়ক বই বিতরণ এবং গান, শর্টফিল্ম, নাটিকা, কবিতা আবৃত্তিসহ আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক দাওয়াতি উপকরণ প্রকাশ করা ও শ্রমিক জনগোষ্ঠীর মাঝে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা।
৯. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসসমূহ যথাযথভাবে পালন
শ্রমিক জনগোষ্ঠীকে দাওয়াতি বলয়ে নিয়ে আসা এবং তাদের মাঝে প্রভাব সৃষ্টিতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস সমূহে সাধারণ শ্রমিকদের সম্পৃক্ততামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা। ফেডারেশন, জাতীয় ইউনিয়ন, ট্রেড ইউনিয়নের ব্যানারে র্যালি, শ্রমিক সমাবেশ, আলোচনা সভা, বনভোজন, সামষ্টিক ভোজ, বøাড গ্রæপিং, স্বেচ্ছায় রক্তদান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, মেডিকেল ক্যাম্প, কর্মসংস্থানমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন সাধারণ শ্রমিকদের দাওয়াতি বলয়ে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
১০.টার্গেটভিত্তিক দাওয়াতি কার্যক্রম
টার্গেটভিত্তিক দাওয়াতি কার্যক্রম দাওয়াতের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মপন্থা। এ কর্মপন্থায় প্রত্যেক জনশক্তিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিয়মিত দাওয়াতি কাজ করা এবং টার্গেটকৃত শ্রমিকদের চিন্তার পরিশুদ্ধির জন্য পরিকল্পিতভাবে কুরআন, হাদিস, ইসলামি বই ও দাওয়াতি উপকরণ বিলি করা প্রয়োজন। পরিকল্পিতভাবে দাওয়াতি বই বিলি, নিজেদের নেক আমল, উত্তম ব্যবহার ও সেবার মাধ্যমে টার্গেটকৃত শ্রমিকদের নিকট ইসলামি আদর্শের পূর্ণাঙ্গ ধারণা তুলে ধরার চেষ্টা করা।
১১. ব্যক্তিগত যোগাযোগ
দাওয়াত দেওয়ার ফলপ্রসূ কৌশলের অন্যতম হচ্ছে ব্যক্তিগত ভাবে যোগাযোগ করা। একজন শ্রমিকের সাথে সম্প্রীতি স্থাপন এবং নিয়মিত দেখা সাক্ষাত ও যোগাযোগ তাকে ক্রমান্বয়ে সংগঠনের শামিল হতে পরিবেশ তৈরি করে।
১২.ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন ও সম্পর্ক বৃদ্ধি:
দাওয়াত সম্প্রসারণে টার্গেটকৃত ব্যক্তির সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন ও সম্পর্ক বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে পরিকল্পিত সময় দেওয়া, একত্রে চা-নাস্তা খাওয়া, বিপদে-আপদে সাহায্য করা, বিভিন্ন উপহার দেওয়া, বিভিন্ন উপলক্ষ্যে দাওয়াত দেওয়া, বিভিন্ন কাজ সহযোগিতা করা, কোন অভিযোগ থাকলে তা দূর করার চেষ্টা করা, ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করার চেষ্টা করা, পারিবারিক খোঁজ-খবর নেওয়া ইত্যাদি কার্যক্রম ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করে থাকে।
১৩.পর্যায়ক্রমিক বা ক্রমধারা অবলম্বন
দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রথম সাক্ষাতেই দাওয়াত প্রদান কৌশলের পরিপন্থী। পরিচয়, বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতার পর্যায়গুলো অতিক্রম করার পরই দাওয়াত দান করা সবচেয়ে উত্তম কর্মপন্থা। এছাড়া প্রথম বৈঠকে বা সাক্ষাতে সবকথা বলার চেষ্টা করা বিজ্ঞানসম্মত নয়। কয়েকবার আলোচনার মাধ্যমে দাওয়াত গ্রহণের বিষয়ে তার অনুভ‚তিকে জাগ্রত করে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথমেই সংগঠনের মূল দাওয়াত না দিয়ে ইসলামের মৌলিক বিধি-বিধান পালনে উৎসাহিত করা, ইসলাম মেনে চলার দাওয়াত দেওয়া, সংগঠন সম্পর্কে কোন ভুল ধারণা থাকলে তা দূর করার চেষ্টা করা, সমস্যা নির্ণয়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের ভূমিকা পালন, খুঁটিনাটি বিষয়কে পরিহার করে ইসলামের প্রাথমিক বুনিয়াদী মূলনীতি সমূহের ভিত্তিতে বাস্তব জীবন গড়ে তোলার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া।
১৪.বিশেষ দাওয়াতি অভিযান
কম সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিকদের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর পদক্ষেপ হিসেবে নিয়মিত দাওয়াতি কাজের পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা যেকোনো সংগঠনের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে থাকে। এর মধ্য দিয়ে সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক জনশক্তি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দাওয়াতি ময়দানে ভূমিকা পালন করার সুযোগ পায়। প্রতিদিন সময় করে পাড়া-মহল্লা, কল-কারখানায় দাওয়াতি তৎপরতার ফলে সংগঠনের পক্ষে জনমত গঠন করা সহজ হয় এবং নতুনভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিকদের কাছে পৌঁছা সহজ হয়।
১৫.পেশাভিত্তিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ
পেশাভিত্তিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে তৃণমূল শ্রমিক জনগোষ্ঠীর নিকট আদর্শিক দাওয়াত পৌঁছানোর সুযোগ বৃদ্ধি পায়। শ্রমিকরা সাধারণত নিজ নিজ পেশার ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ থাকা এবং আন্দোলন করতে বেশি আগ্রহী থাকে। পেশাভিত্তিক আন্দোলন বা সংগঠনের মাধ্যমে শ্রমিকদের সমস্যা দ্রæত সময়ে সমাধান করা যায় এবং শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট যে কোনো ইস্যুতে আঞ্চলিক ও জাতীয় ভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তোলা যায় পেশাভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা ও শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখার মাধ্যমে শ্রমিকদের মাঝে দাওয়াত পৌঁছানোর উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
১৬.ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রম বৃদ্ধি করা
ট্রেড ইউনিয়ন সাধারণ শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া বা ঐক্যবদ্ধ থাকার অন্যতম প্ল্যাটফরম। সাধারণ শ্রমিকদের দাওয়াতের বলয়ে আনার ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ট্রেড ইউনিয়নের ব্যানারে শ্রমিক সভা, সেবামূলক কার্যক্রম, সামষ্টিকভোজ, বনভোজন, শ্রমিকদের সমস্যা ও দাবি দাওয়া নিয়ে সভা, আইনি সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসসহ জাতীয় দিবস সমূহ যথাযথভাবে উদযাপনের মধ্য দিয়ে সাধারণ শ্রমিকদের দাওয়াতি বলয়ে নিয়ে আসা সহজ হয়।
১৭.আইনি সহযোগিতামূলক কার্যক্রম
দরখাস্ত/শোকজের জবাব লিখে দেওয়া, মামলা করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা, মামলা করে মজুরি আদায়, আলোচনার মাধ্যমে মজুরি আদায়, সাধারণ ডায়েরি (জিডি), স্মারকলিপি পেশ, মালিকপক্ষের সাথে সমঝোতা বৈঠক, চাকুরিচ্যুত শ্রমিকদের চাকুরির ব্যবস্থা প্রভৃতি আইনি সহযোগিতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সাধারণ শ্রমিকদের মাঝে সংগঠনের দাওয়াত পৌঁছানো যায়।
১৮.তথ্য প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার
শ্রমিক জনগোষ্ঠীর নিকট দাওয়াত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারকে গুরুত্ব প্রদান করা। বর্তমানে সাধারণ শ্রমিক জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই সোস্যাল মিডিয়ার সাথে সম্পৃক্ত। সোস্যাল মিডিয়ার পরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে শ্রমিক জনগোষ্ঠীর নিকট সংগঠনের বক্তব্য ও শ্রমিক অধিকার ইস্যুতে সংগঠনের গৃহীত কর্মসূচি পৌঁছানো সম্ভব। যার ফলে সরাসরি দাওয়াত না পেলেও নিজের অবস্থান থেকে সে সংগঠনের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করবে। যা পরবর্তীতে তাকে সংগঠনে সম্পৃক্ত হতে উৎসাহ জোগাবে।
আমাদেরকে মনে রাখতে হবে প্রত্যেক নবি স্ব-স্ব যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষদের কাছে দ্বীনি দাওয়াতকে আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছেন। হযরত দাউদ (আ.) যে যুগে এসেছিলেন তখন সুরের খুব কদর ছিল। এজন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন দাউদ (আ.) এর গলায় এমন সুর দিয়েছিলেন যে, তিনি যখন কিতাব তেলাওয়াত করতেন তখন পানির মাছ স্থলে ভীড়ে তা শুনতো। হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন পৃথিবীতে আসেন তখন আরবে সাহিত্যের খুব উৎকর্ষতা ছিল। এজন্য মহান আল্লাহ কুরআনকে এমন সাহিত্য কর্ম হিসেবে পেশ করলেন যে, কেউ আর অনুরূপ একটি সুরা এমনকি একটি আয়াতও রচনা করতে পারলো না। এজন্য আমাদেরকে সময়ের গতিধারা লক্ষ্য করে বৈধ সকল মাধ্যম ব্যবহার করে দাওয়াতকে সম্প্রসারিত করতে হবে।
তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে দাওয়াত পৌঁছানোর লক্ষ্যে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার উপযোগী জনশক্তির তালিকা করে নিয়মিত দাওয়াতি কাজ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা, পরিকল্পিত দাওয়াতি পোস্ট দেওয়া, শ্রমজীবী মানুষের সাথে সম্পর্কিত দাওয়াতি শর্ট ফিল্ম, গান, ডকুমেন্টরি ও অন্যান্য অনলাইন দাওয়াতি উপকরণ প্রচার-প্রচারণায় ভূমিকা রাখা।
১৯.কুরআন শিক্ষা/গণশিক্ষা কার্যক্রম
শ্রমিক জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ স্বল্প শিক্ষিত হওয়ার কারণে ইসলামের মৌলিক দিকগুলোর বিষয়ে তারা অবগত নয়। তাদের মাঝে কুরআন ও নামাজ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা, নামাজের গুরুত্ব, হালাল-হারামের বিধান, হাদিস পাঠ, মাসয়ালা-মাসায়েল ও নিয়মিত দোয়া-কালাম শিক্ষা প্রভৃতি কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে দাওয়াতি কাজ করা। ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম যিনি নিজে কুরআন শিখে এবং অন্যকে কুরআন শিক্ষা দেন’ এ হাদিসের আলোকে যে সকল জনশক্তি সহিহ ভাবে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারে তাদেরকে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় অন্যান্য শ্রমিকদের কুরআন শিখানোর বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা। দুনিয়ার কল্যাণের পাশাপাশি আখেরাতের কল্যাণের বিষয়টি বুঝাতে সক্ষম হলে তারা সহজেই দাওয়াতকে গ্রহণ করে সংগঠনে সম্পৃক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
২০.গ্রুপভিত্তিক দাওয়াতি তৎপরতা
নিয়মিত দাওয়াতি কার্যক্রম, টার্গেটভিত্তিক দাওয়াতি কাজের পাশাপাশি সংগঠনের তৃণমূল স্তরের জনশক্তিদের মাসে কমপক্ষে দুইবার স্ব-স্ব এলাকায় ৩-৫ জনের গ্রæপের মাধ্যমে সামষ্টিকভাবে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে দাওয়াতি তৎপরতা পরিচালনা দাওয়াত সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। শ্রমঘন এলাকা, রিকশা-সিএনজি গ্যারেজ, ছোট ছোট ফ্যাক্টরি, বাজার কেন্দ্রীক গ্রুপভিত্তিক দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করার উদ্যোগ নেওয়া। গ্রুপের সদস্যগণকে দাওয়াত প্রদানকালে সাথে দাওয়াতি বই, পরিচিতি, ডি-ফর্ম ও প্রয়োজনীয় দাওয়াতি সামগ্রী সাথে রাখতে হবে।
২১. সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক কার্যক্রম
শ্রমিকরা সাধারণত কাজ শেষে অবসর সময় বিনোদন পেতে চায়। যার মাধ্যমে তারা শরীরের ক্লান্তিকে অবসান করে থাকে। বিভিন্ন দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে শ্রমঘন এলাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতাসহ আকর্ষণীয় শ্রমিক বান্ধব সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মাধ্যমে শ্রমিক জনগোষ্ঠীর মাঝে দাওয়াত প্রদানের পরিবেশ তৈরি করা যায়। এছাড়া সুস্থ সংস্কৃতির প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে শ্রমিকদের নিয়ে গান, নাটিকা, শর্টফিল্ম তৈরি এবং পরিবেশনের ব্যবস্থা করা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে শ্রমঘন এলাকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মঞ্চ নাটক পরিবেশন, শ্রমিকদের অংশগ্রহণ উপযোগী বিভিন্ন প্রতিযোগিতাসহ আকর্ষণীয় ও উপভোগ্য সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা।
২২.কল-কারখানা, শিল্প প্রতিষ্ঠান, শিল্পাঞ্চল ও শ্রমঘন এলাকাকে দাওয়াতের কেন্দ্র বানানো
কল-কারখানা, শিল্প-প্রতিষ্ঠান, শিল্পাঞ্চল ও শ্রমঘন এলাকাকে বিশেষ দাওয়াতি প্রজেক্টের আওতায় নিয়ে এসে পরিকল্পিত দাওয়াতি তৎপরতা পরিচালনা করা। যে সব প্রতিষ্ঠানে বা এলাকায় এখনো দাওয়াত পৌঁছেনি সে সব প্রতিষ্ঠান বা এলাকাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করা। এর মধ্য দিয়ে কম সময়ে বেশি সংখ্যক শ্রমিককে দাওয়াত প্রদান ও সংগঠনে সম্পৃক্ত করার পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে। এসব প্রতিষ্ঠান এবং শ্রমঘন এলাকায় শ্রমিক সভা, তাফসির মাহফিল, সীরাতুন্নবি (সা.) মাহফিল, ইফতার মাহফিল, মসজিদে নিয়মিত সাপ্তাহিক আলোচনা, ইসলাম ও ইসলামি শ্রমনীতি বিষয়ক আলোচনা সভার আয়োজন, খুতবার পূর্বে আলোচনা, হাদিস পাঠ, সহিহ তেলাওয়াত শিক্ষার ব্যবস্থা, মাঝে মাঝে মাসয়ালা-মাসায়েল শিক্ষার ক্লাস, ইসলামি দিবসসমূহ পালন, বিখ্যাত বক্তাদের ওয়াজ ও আলোচনা শুনানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা।
২৩.সর্বাবস্থায় দাওয়াতি তৎপরতা অব্যাহত রাখা
দাওয়াতের জন্য কোনো সময় নির্দিষ্ট নেই। দিন-রাত, সকাল-বিকাল, দিন-দুপুর বা রাত-দুপুর, শীতকাল-গ্রীষ্মকাল, অনুকূল-প্রতিকূল যেকোনো অবস্থায় ও যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে বা গোপনে জনসমক্ষে বা কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে বক্তৃতার মঞ্চে জুলুম-নির্যাতনের চরম অবস্থায়ও দাওয়াতি তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। পরিবেশ পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে এ মহান দায়িত্ব পালনে অবহেলা প্রদর্শনের সুযোগ নেই। দাওয়াত হল এক সার্বক্ষণিক ও অব্যাহত প্রচেষ্টা। কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হযরত নূহ (আ.) কথা উল্লেখ করে বলেন, “তিনি বলেন, হে প্রভু আমি আমার জাতিকে রাতে দিনে সর্বাবস্থায় দ্বীনের দিকে আহ্বান করেছি। (সুরা নূহ : ৫)
২৪.সর্বপর্যায়ের জনশক্তিকে সেবামূলক কাজে সম্পৃক্ত করা
সাংগঠনিক উদ্যোগের পাশাপাশি জনশক্তিকে তার অবস্থান থেকে সেবামূলক কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। জনশক্তিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে শ্রমিক প্রতিবেশীর খোঁজ খবর নেওয়া, প্রসূতি সেবা, নবজাতককে দেখতে যাওয়া, মাইয়্যেতের দাফন-কাফনে অংশগ্রহণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আকস্মিক দুর্ঘটনায় নিপতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অসহায় শ্রমিকদের মাঝে সামর্থ্যরে আলোকে দুই ঈদে শাড়ি, লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, সেমাই-চিনি ও কুরবানির গোশত বিতরণ, শ্রমিকদের আইনি সহযোগিতা প্রদান, বেকার শ্রমিকদের কর্মসংস্থান প্রভৃতি সেবামূলক কাজে অংশগ্রহণের গুরুত্ব বুঝানো ও সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া। এ সকল কর্মতৎপরতার মাধ্যমে শ্রমিকদের হৃদয় মন জয় করার মাধ্যমে আদর্শের দাওয়াত সম্প্রসারণ করা সহজতর হবে।
২৫.পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা
শ্রমিক-কর্মচারীদের চাকুরি জীবনে প্রশিক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি তাদের পদোন্নতি ও বেতন বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ দিক। সংগঠনের উদ্যোগে শ্রমিকদের পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দাওয়াত সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
২৬.সকল শ্রমিকদের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোর কৌশল তৈরি করা
যেকোনো আদর্শের পক্ষে অধিকাংশ জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ বা সহযোগী করতে না পারলে সে আদর্শকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বাস্তবায়ন করা সম্ভবপর নয়। ফলে জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের মাঝে আদর্শের সম্যক ধারণা প্রদান জরুরি। শ্রমিক সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সকল শ্রমিক জনগোষ্ঠীর নিকট দাওয়াত পৌঁছানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করতে হবে। যাতে কোনো না কোনো ভাবে তাদেরকে দাওয়াতের বলয়ে নিয়ে আসা যায়।
২৭. প্রভাবশালী শ্রমিকদের মাঝে দাওয়াতি কাজ বৃদ্ধি
শ্রমিকদের মাঝে যারা অপেক্ষাকৃত নেতৃত্বের গুণাবলি সম্পন্ন, সাহসী, বাকপটু, অন্যান্য শ্রমিকদের মাঝে গ্রহণযোগ্য তাদের মাঝে টার্গেটভিত্তিক দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করা। প্রভাবশালী অল্প সংখ্যক শ্রমিক বিশাল শ্রমিক জনগোষ্ঠীর নিকট দাওয়াত পৌঁছানোর পরিবেশ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে।
২৮. অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ
দাওয়াতি কাজের অংশ হিসেবে অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এর মাধ্যমে অন্যান্য শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ শ্রমিকদের মাঝে চারিত্রিক ও আদর্শিক প্রভাব সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়। যা শ্রমিক নেতৃবৃন্দ সাধারণ শ্রমিকদের মাঝে দাওয়াত সম্প্রসারণে সহায়ক হয়ে থাকে।
২৯.মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মাঝে দাওয়াত
কল-কারখানা, শিল্প-প্রতিষ্ঠানে মালিক ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অধীনে শ্রমিকরা কর্মরত থাকায় তাদের মাঝে টার্গেট ভিত্তিক দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ সংগঠনের ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান শিল্প কল-কারখানায় দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডির মধ্যে সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা, ইফতার মাহফিল, বিভিন্ন দিবস উপলক্ষ্যে দাওয়াতিমূলক কর্মসূচি সহজে পালন করা যায়।
৩০. শ্রমিকদের উপযোগী পত্রিকা, ম্যাগাজিন প্রকাশ
শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট পত্রিকা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে সচেতন শ্রমিকদের মাঝে দাওয়াত পৌঁছানো যায়। শ্রমিকদের অধিকার, সমস্যা এবং ন্যায্য মজুরি বিষয়ে পত্রিকায় লেখালেখি এবং তা বিতরণের মাধ্যমে সংগঠনের পক্ষে জনমত তৈরি হয়।
ইউনিট
৩১.দাওয়াতি ইউনিট প্রতিষ্ঠা
কল-কারখানা, শিল্প-প্রতিষ্ঠান, শ্রম এলাকায় ব্যাপক ভিত্তিক দাওয়াতি ইউনিট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রমিকদের কাছে পৌঁছার পরিবেশ সৃষ্টি করা যায়। দাওয়াতি ইউনিট নিয়মিত দাওয়াতিমূলক শ্রমিক সভার আয়োজন করলে স্বল্প সময়ে অধিক সংখ্যক শ্রমিককে দাওয়াতি বলয়ে নিয়ে আসা সম্ভব।
৩২.জনশক্তির মাঝে দাওয়াতি চরিত্র সৃষ্টি
সংগঠনের সকল পর্যায়ের জনশক্তির মাঝে দাওয়াতি চরিত্র তৈরি করতে পারলে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মাঝে দাওয়াত সম্প্রসারণ করা সহজ হয়। দাওয়াতি কাজ নবি-রাসুলগণের মিশন এবং প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তির জন্য ফরজ। জনশক্তির মাঝে এই অনুভূতি সৃষ্টিতে ও দাওয়াতি কাজকে জীবনের মিশন হিসেবে গ্রহণ করানোর লক্ষ্য সাংগঠনিক মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
৩৩.ইউনিটের মজবুতি
সাংগঠনিক ইউনিট মজবুত ও সক্রিয় হলে দাওয়াতি কাজ গতিশীল থাকে। প্রত্যেক ইউনিট মাসে কমপক্ষে ১ বার পরিকল্পিত দাওয়াতি গ্রুপ বের করলে তৃণমূল শ্রমিক জনগোষ্ঠীর নিকট সহজেই দাওয়াত পৌঁছানো সম্ভব হয়। এছাড়া নিয়মিত দাওয়াতি তৎপরতার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শিল্প কল-কারখানা বা এলাকায় শ্রমিকদের মাঝে দাওয়াত পৌঁছানোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
৩৪.শ্রমিক নেতৃবৃন্দের মাঝে দাওয়াত
শ্রমিক ময়দানে দাওয়াত সম্প্রসারণে ও প্রভাব বলয় বৃদ্ধিতে বিভিন্ন পেশার শ্রমিক নেতৃবৃন্দের কাছে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উদ্যোগ দাওয়াত পৌঁছানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বিভিন্ন পেশায় প্রভাবশালী শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের মাঝে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি ও দাওয়াতি বলয়ে নিয়ে আসার লক্ষ্যে চা-চক্র, ফল চক্র, পিঠা চক্র, মতবিনিময় সভা, ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াত খাওয়ানো, সামষ্টিক ভোজের আয়োজন, নববর্ষের প্রকশনা সামগ্রী বিতরণ, বিভিন্ন উপলক্ষ্যে উপহার প্রদান, বিপদে-আপদে প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানসহ তাদের পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার উদ্যোগ নেওয়া।
৩৫.নারী শ্রমিকদের মাঝে দাওয়াত
দেশের মোট শ্রম শক্তির অর্ধেকের বেশি নারী শ্রমিক। নারী শ্রমিকদের মাঝেও পরিকল্পিত দাওয়াতি কাজের বিকল্প নেই। দাওয়াতি সভা, সহিহ কুরআন শিক্ষা ও মাসয়ালা-মাসায়েল শিক্ষার মাধ্যমে নারী শ্রমিকদের মাঝে দাওয়াতি কাজের উদ্যোগ নেওয়া। নারীদের উপযোগী দাওয়াতি উপকরণ যেমনÑ বই-পুস্তক, বোরকা, স্কার্ফ, চাদর, হিজাব, সেলোয়ার ইত্যাদি উপহার দেওয়া।
৩৬.শ্রমিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আন্দোলন গড়ে তোলা
শ্রমিক ময়দানে দাওয়াত সম্প্রসারণে শ্রমিক সংগঠনকে শ্রমিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ভূমিকা রাখা অপরিহার্য। শ্রমিকদের মনজগতে স্থান করে নেওয়ার এটি অন্যতম দিক। শ্রমিক সংগঠনকে শ্রমিকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে পরিচালনা করা প্রয়োজন। শ্রমিকদের সমস্যায় ভূমিকা রাখার মধ্য দিয়ে সহজেই সাধারণ শ্রমিকদের নিকট সংগঠনের দাওয়াত পৌঁছানোর পরিবেশ তৈরি হয়। শ্রমিকরাও সংগঠনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করে থাকে। শ্রমিক ময়দানে প্রকাশ্য ভূমিকার মধ্য দিয়ে দাওয়াত সম্প্রসারণ বেগবান হয়।
আল্লাহর দিকে মানবজাতিকে আহŸানের গুরুত্ব এত বেশি যে আল্লাহ তায়ালা এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছ কিনা এ প্রশ্ন শুধু উম্মতের নিকট নয় বরং সমস্ত আম্বিবায়ে কেরামকে এ কঠিন প্রশ্নের জবাবদিহির কাঠগড়ায় হাজির করাবেন। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন, “হে রাসুল! আপনার উপর আপনার প্রভু হতে অবতীর্ণ কিতাবের তবলীগ করুন। এ দাওয়াতি কাজ যদি না করেন তবে রেসালাতের দায়িত্বই পালন করা হয়নি।” (সুরা মায়েদা : ৬৭)
আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট দাওয়াত দানকারীর কথাই উত্তম কথা। আল্লাহ বলেন, “ঐ ব্যক্তির চেয়ে উত্তম কথা কার হতে পারে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকে, নেক আমল করে এবং বলে আমি একজন মুসলমান।” (সুরা হামিম আস সাজদাহ : ৩৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যারা মানুষকে কল্যাণের শিক্ষা দেয়। আল্লাহর ফিরিস্তা, আকাশ ও জমিনের সবকিছু এমন কি পিপিলিকা ও সমুদ্রের মাছ তাদের জন্য দোয়া করে।” (সহিহ তিরমিজি)
বর্তমানে আল্লাহর পথে মানবজাতিকে আহŸানের এ গতি অত্যন্ত মন্থর। নানা অজুহাতে ঈমানের এ প্রধানতম দাবি থেকে ঈমানদাররা আজ নিজেদেরকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছে। অথচ আল্লাহর প্রিয়তম বান্দারা পথ হারিয়ে দাউ দাউ আগুনের লেলিহান শিখার দিকে এগিয়ে চলছে। এ ভয়াবহ দৃশ্য অবলোকন করার পর তাদেরকে বাঁচাবার সামান্যতম আবেগ যাদের হৃদয়ে থাকবে না তাদের পক্ষে শুধু নিজেরাই ব্যক্তিগত ইবাদতের বিনিময়ে জান্নাতে গমন হবে এমন অসম্ভব, সূচের ছিদ্র দিয়ে উটের গমন যেমন অসম্ভব।
সুতরাং আমাদের মুসলমানদেরকে প্রকৃত মুসলমান বানানো, তাদের মধ্যে সঠিক ইসলামি উদ্দীপনা সঞ্চার এবং তাদের জীবনকে সঠিক ইসলামি ছাঁচে ঢালাই করার জন্য দাওয়াতি কর্মতৎপরতা যেকোনো পরিবেশ পরিস্থিতিতে অব্যাহত রাখতে হবে।