প্রতিষ্ঠা

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন প্রতিষ্ঠার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

ভূমিকা

সৃষ্টিজগতের প্রতিটি বিষয় সুনির্দিষ্ট বিধান ও শৃঙ্খলার অধীন পরিচালিত হচ্ছে। এই শৃঙ্খলাই সৃষ্টি করেছে ভারসাম্য, শান্তি ও ন্যায়। মানবজাতিও যদি সেই ন্যায়ভিত্তিক বিধান অনুসরণ করে, তবে সমাজে বৈষম্য, বিশৃঙ্খলা ও অনধিকার চর্চার অবসান ঘটতে পারে এবং প্রতিষ্ঠিত হতে পারে ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির সমাজব্যবস্থা। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্যতার প্রশ্নে ইসলামী দর্শনে একটি সুস্পষ্ট ও মানবকল্যাণমুখী দিকনির্দেশনা বিদ্যমান, যা কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক নীতিমালার মাধ্যমে সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য।

এই ন্যায়ভিত্তিক শ্রমনীতির আলোকে শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণ ও অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সূচনা হয়।


ঐতিহাসিক পটভূমি

ব্রিটিশ ভারত ও পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান আমলে শ্রমিক আন্দোলন মূলত সমাজতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ দুটি ধারায় পরিচালিত হতো। বিশেষত সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ শ্রমিক আন্দোলনের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে এবং বিশ্বের বহু দেশে শ্রমিক আন্দোলন সেই ধারায় পরিচালিত হতে থাকে। এই সময়ে শ্রমিকদের একত্রীকরণের নামে বিভিন্ন স্লোগানের মাধ্যমে আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয় এবং ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যম হিসেবে পরিণত হয়।

পরবর্তীতে যেসব দেশে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে শ্রমজীবী মানুষ ব্যক্তি মালিকানার সীমিত স্বাধীনতা থেকেও বঞ্চিত হয়ে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অধীনে চলে যায়। রাষ্ট্রই হয়ে ওঠে সকল শিল্পকারখানার মালিক, ফলে শ্রমিকদের জন্য ন্যায্য দাবি আদায়ের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে। একইভাবে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাও শ্রমজীবী মানুষের মৌলিক সমস্যার টেকসই সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়। উভয় ব্যবস্থাই মানবসৃষ্ট আইনের সীমাবদ্ধতা ও পক্ষপাতের কারণে শ্রমজীবী মানুষকে প্রকৃত মুক্তি দিতে পারেনি।

এই প্রেক্ষাপটে শ্রমিক অঙ্গনে ইসলামী আদর্শভিত্তিক একটি বিকল্প ও কল্যাণমুখী সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হতে থাকে।


সূচনা ও প্রতিষ্ঠা

এই ঐতিহাসিক বাস্তবতায় ১৯৬৫–৬৭ সময়কালে ব্যারিস্টার কুরবান আলী ও ব্যারিস্টার আক্তার উদ্দিন শ্রমজীবী মানুষের মাঝে সেবামূলক কার্যক্রম ও আইনি সহায়তা প্রদান শুরু করেন। তাদের এই উদ্যোগ দ্রুত শ্রমিক মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। আদমজী, ডেমরা, নারায়ণগঞ্জ, তেজগাঁও ও টঙ্গীসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক তাদের সমস্যা সমাধান ও আইনি সহায়তার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে।

এ সময় শ্রমজীবী মানুষের পাশে পেশাগত দায়িত্বের বাইরে এসে আইনগত সহায়তা প্রদানের এমন দৃষ্টান্ত পূর্বে খুব কমই দেখা গিয়েছিল। ফলে শ্রমিক সমাজে এই উদ্যোগ আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে।

১৯৬৫ সালের মাঝামাঝি মংলা বন্দরে শ্রমিক ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে উদ্ভূত সংকটে ব্যারিস্টার কুরবান আলীর মধ্যস্থতায় সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায় সম্ভব হয়। এই ঘটনার মাধ্যমে তার নেতৃত্ব শ্রমিক সমাজে আরও দৃঢ়তা লাভ করে।

শ্রমজীবী মানুষের আগ্রহ ও পরামর্শের ভিত্তিতে অবশেষে ১৯৬৮ সালের ২৩ মে “শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন” আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটির নিবন্ধন হয় “জাতীয় ফেডারেশন–৩” নম্বরে। প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলেন ব্যারিস্টার কুরবান আলী এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ড. গোলাম সরোয়ার।


প্রতিষ্ঠাতৃবৃন্দ

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন প্রতিষ্ঠায় যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—
ব্যারিস্টার কুরবান আলী, ব্যারিস্টার আক্তার উদ্দিন, ড. গোলাম সরোয়ার, সাইয়্যেদ শহীদ শফিউল্লাহ (ফেনী), গোলাম মোস্তফা, মাহবুবুর রহমান, আব্দুল ওয়াহেদ এবং মফিজ উদ্দিন।


কার্যালয় ও সাংগঠনিক অগ্রগতি

শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের প্রথম কার্যালয় স্থাপিত হয় ঢাকার ১৫ নম্বর নয়া পল্টনে। প্রাথমিক পর্যায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় সিদ্দিক বাজারের কাউছার হাউজে। উক্ত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা একেএম ইউসুফ, মাস্টার শফিকুল্লাহ, ব্যারিস্টার আক্তার উদ্দিন, ব্যারিস্টার কুরবান আলী, ড. গোলাম সরোয়ার, শহীদ সাইয়্যেদ শফিউল্লাহ, আব্দুল ওয়াহেদ, মাহবুবুর রহমান, গোলাম মোস্তফা ও মফিজ উদ্দিনসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর শিল্প সম্পর্ক অধ্যাদেশ (১৯৬৯) ও শিল্প সম্পর্ক বিধিমালা (১৯৭৭)-এর আলোকে সংগঠনটি বাংলাদেশ সরকারের শ্রম দপ্তর থেকে পুনরায় নিবন্ধন লাভ করে। ১৯৭৯ সালের ১৫ মে সংগঠনটির নিবন্ধন সম্পন্ন হয়, যার নিবন্ধন নম্বর ছিল “বাংলাদেশ জাতীয় ফেডারেশন (বা.জা.ফে–০৮)”।